ফিচার

রাজিবপুরে বর্ডার হাটে বদলে গেছে অর্থনৈতিক চাকা

  সোহেল রানা স্বপ্ন, রাজিবপুর ২৮ নভেম্বর ২০২৩ , ৭:০৪ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দুই পাড়ের মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে সীমান্ত হাট। গড়ে উঠেছে স¤প্রীতি, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ। হাটবারের দিন সীমান্ত হাট পরিণত হয় দুই পাড়ের বাসিন্দাদের মিলনমেলায়। সীমান্ত হাট অভিমুখে শত শত মানুষের স্রোত। দেখে মনে হবে কোনো মেলা বা উৎসবে যাচ্ছেন তারা। আসলে কোনো মেলা নয়, সবার গন্তব্য কুড়িগ্রামের বালিয়ামারি-কালাইয়ের চর সীমান্তে নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসা সীমান্ত হাট। হাটে নানা বয়সী মানুষের ভিড়। কেউ ক্রেতা, কেউ বিক্রেতা, কেউবা অনেক দূর থেকে আসা দর্শনার্থী। দোকানে দোকানে বাহারি পণ্যের সমাহার। ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই ব্যস্ত। নির্ধারিত সময়ে কেনাবেচা, ঘোরাঘুরি সব শেষ করতে হবে।

প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও বুধবার এই দুই দিন হাট বসে সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৩ টা পর্যন্ত দুই দেশের সীমান্তে এই হাট বসে। হাটে দুদেশের শত শত মানুষ জড়ো হয়। বালিয়ামারি বাজার থেকে প্রথমে জিঞ্জিরাম নদীর ঘাটে তারপর নৌকা দিয়ে পার হতে হয়। নদী পার হয়েই বর্ডার হাট। হাটের চারদিকে ধানক্ষেত, তার মাঝে কয়েকটি আধাপাকা ঘর। সীমান্ত হাটে প্রবেশ করার জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতা পরিচয় পত্র দেখিয়ে বাজারের মুখে বিজিবি খাতায় এন্টি করে বাজারে প্রবেশ করতে হয়। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ২০০ ডলার পরিমান টাকার মাল ক্রয় করতে পারেন। বাজারে একপাশে বাংলাদেশি বিক্রেতারা বসেছেন, অন্যপাশে ভারতীয় বিক্রেতারা। বিজিবি বা বিএসএফকে পাস বা পরিচয়পত্র দেখিয়ে বাজারে প্রবশ করছেন ক্রেতারা। মানুষের ভিড় হলেও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। লাইন ধরে এন্ট্রি করে সবাই যাচ্ছেন সীমান্ত হাটে।

বাংলাদেশি দোকানগুলোতে দেখা যায়, বিস্কুট, মাছ,গুড়, প্লাস্টিক ও কাঠের তৈরি বিভিন্ন খেলনা, চানাচুর, শীতের কাপড়, নকশীকাঁথা, ও শুকনো সুপারি বিক্রি করতে। আর ভারতীয় দোকান গুলোতে দেখা যায়, শোনপাপড়ি, চকলেট, বিস্কুট কেক, পানীয় আইটেম সামগ্রী,আপেল, কমলাসহ ফলমূল, ধনিয়া, জিরা ও প্রসাধনী মসলা।

সরজমিন দেখা গেছে, হাটকে ঘিরে ভারতীয় পণ্য সামগ্রী ক্রয় বিক্রয় করে একদিক যেমন লাভবান হচ্ছেন ক্রেতা বিক্রেতাগন অন্যদিকে এই হাট কে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে সীমান্ত এলাকার হাজারো মানুষের।

বালিয়ামারি ব্যাপারি পাড়ার গাড়ি চালক সেলিম মিয়া বলেন আগে ৩০০-৪০০ টাকা রোজগার করতাম ভ্যান চালিয়ে এখন প্রতি বর্ডার হাটের দিন আসলে ১০০০-১২০০ টাকা রোজগার হয়। এই হাট চালু হওয়ায় আমি অনেক খুশি।

নৌকা চালক শহিদুল জানান আগে নৌকা দিয়ে মাছ ধরতে বের হতাম কোন দিন মাছ পাওয়া যেত কোন দিন পাওয়া যেত না। সংসার চালাতে অনেক কষ্টে হত। এখন হাটের দিন আসলে দর্শনার্থী ও মালামাল পারাপার করে ৫০০-৭০০ টাকা রোজগার করি। এখন সংসার চালাতে আর আগের মতো কষ্ট হয়না।

কার্ডধারি ক্রেতা মুমিনুল ইসলাম মিন্টু বলেন স্থানীয় বাজার থেকে ফলমুল কিনে খাওয়া অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়তো কিন্তু বর্ডার হাট থেকে অল্প দামে ফলমূল কিনে পরিবারের সবাই খেতে পারছি। এই হাট চালু হওয়ায় পরিবারের সবাই খুশি।

কার্ডধারি বিক্রেতা বেলাল হোসেন ভেলু বলেন হাটটি চালু হওয়ায় শুধু একজন বিক্রেতা হিসেবে আমি একা নই বালিয়ামারি সীমান্ত হাটে ক্রেতা বিক্রেতার উপর নির্ভর করে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের জীবিকার অন্বেষন হয়েছে। আমাদের এই সীমান্তে হাটটি চালু করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।

রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ বলেন সীমান্ত হাট চালু হওয়ায় স্থানীয় লোকজন উপকৃত হয়েছে। এই হাটের মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে এই অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। দুই দেশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন এর পাশাপাশি দুই দেশের মানুষের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে।

রাজিবপুর উপজেলাধীন বালিয়ামারী এবং ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কালাইয়ের চরে ১০৭২ আন্তর্জাতিক পিলারের ১৯ নম্বর সাব পিলারের কাছে জিরো পয়েন্টে ২০১১ সালের ২৩ জুলাই স্থাপন করা বর্ডার হাট নামে ভারত-বাংলা যৌথ বাজার চালু হয়।